সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩২ অপরাহ্ন
অনুসন্ধান২৪>> আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না করা নিয়ে বিএনপিতে এক ধরনের বিরোধ তৈরি হয়েছে। এর আগে সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি পদে দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের মধ্যেও বিরোধ হয়। বিএনপির হাইকমান্ডের নির্দেশনা ছিল উপজেলা নির্বাচনে ‘অংশগ্রহণ না করার’। কিন্তু সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে দলটির ৭৬ নেতা ভোটের মাঠে রয়েছেন। যাদের ইতিমধ্যেই বহিষ্কার করা হয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে আগে থেকেই বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে দুই ধরনের মত ছিল। সেটি এখন মতবিরোধে পরিণত হয়েছে বলে দলটির ভেতরে-বাইরে আলোচনা রয়েছে। তবে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অজুহাতে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে নারাজ নেতারা। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির ভেতরের রাজনীতিতে আসন্ন উপজেলা নির্বাচন বড়সড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচনে থাকা নেতাদের যুক্তি হচ্ছে, দলীয় নয় স্বতন্ত্র হিসেবে তারা ভোট করছেন। কিন্তু বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ভাষ্য, তারা এখনো দলের প্রাথমিক সদস্যপদ নিয়ে দলীয় পরিচয় বহন করছেন। নির্বাচনে থেকে গেলে দায়ভারটা বিএনপির ওপরই বর্তাবে। তাই দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ৮ মে প্রথম ধাপসহ উপজেলা নির্বাচনের পরবর্তী ৪ ধাপেই প্রার্থীদের ছাড় দেবে না দলটি।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির নোয়াখালী অঞ্চলের কেন্দ্রীয় এক নেতা, যিনি ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন, তার কাছে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জানতে চেয়েছিলেন, উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি যাওয়া উচিত, নাকি বিরত থাকা উচিত। জবাবে ওই নেতা জানিয়েছিলেন, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ধরে রাখতে হলে নির্বাচনে অংশ নেওয়া উচিত। কেননা, নির্বাচনের সুবাদে দলীয় প্রার্থীদের সঙ্গে কর্মীদের যোগাযোগ বাড়বে। তারা মাঠেও সক্রিয় হতে পারবেন। ফলে একটা সুযোগ নেওয়া উচিত। কথা প্রসঙ্গে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে এও বলেছেন, সাড়ে তিন মাস আগে ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে নিষেধ করেছেন, এখন কেন্দ্রে যাওয়ার কথা বলার সুযোগ নেই। তাই স্বতন্ত্ররা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিক।
জানতে চাইলে দলের যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির দলছুট কিছু সাবেক নেতা এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তারা বিএনপির আদর্শ বহন করে না বলেই নির্বাচনে গেছেন।’
উপজেলা নির্বাচন ঘিরে দলের ভেতরে নানা আলোচনার বিষয়ে বিএনপির একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, শীর্ষ নেতৃত্বের কেউ কেউ নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে নমনীয় ছিলেন। কিন্তু নানা কারণে শক্ত অবস্থান নিতে পারেননি। ওই নেতারা জানান, উপজেলা নির্বাচনে স্বতন্ত্রভাবে হলেও অংশ নেওয়ার পক্ষ নিয়ে দলটির শীর্ষস্থানীয় এক নেতা বলেছেন, এই নির্বাচনে না গেলে দলের ক্ষতি হচ্ছে, সেটা তো অনেকেই বুঝতে চাচ্ছেন না। সম্প্রতি দলের অসুস্থ এক নেতাকে দেখতে গিয়ে শীর্ষস্থানীয় ওই নেতা এ কথা বলেছিলেন। পাশাপাশি তিনি এও বলেছেন, ‘নীরব থেকে সাংগঠনিকভাবে ছাড় দিলেই হয়ে যেত।’
বিএনপির সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিএনপির শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন নেতা দলের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় বলেছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সাংগঠনিক ব্যবস্থার আওতায় না এনে বিএনপি নীরব ভূমিকায় থাকলেই কৌশলী অবস্থানে থাকা হবে। অপেক্ষাকৃত উদারপন্থি নেতাদের এমন বক্তব্য নিয়ে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে। সেখানে দলটির কট্টর অংশের নেতারা এমন মন্তব্যের সঙ্গে একমত না জানিয়ে দেন। তারা বৈঠকে মত দেন, নির্বাচনে গেলে সরকারকে বৈধতা দেওয়া হবে। আন্তর্জাতিকভাবেও তাদের যে লক্ষ্য সেটি ব্যাহত হবে।
স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনার আগে অবশ্যই উপজেলা নির্বাচন নিয়ে দলের ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা, যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক থেকে শুরু করে স্থানীয় উপজেলা নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। প্রায় পৌনে তিনশ নেতার মধ্যে দুশোরও বেশি নেতা উপজেলা নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার পক্ষে মত দেন। ওই নেতারা এই নির্বাচনকে নানাভাবে মূল্যায়ন করেন। তাদের কেউ কেউ, নেতাকর্মী ও জনসমর্থন ধরে রাখতে বিএনপির নির্বাচনে যাওয়া উচিত এমন পরামর্শ দিলেও বেশিরভাগই এই নির্বাচন বিএনপির জন্য ‘ফাঁদ’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন। নির্বাচনে না যাওয়া অংশের নেতাদের মতে, দুটি কৌশল থেকে সরকার এবার দলীয় প্রতীকে উপজেলা নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে সংসদ নির্বাচন বর্জনকারী বিএনপিকে নির্বাচনে আনা। এটি সম্ভব হলে ‘একতরফা’ ও ‘ডামি’ সংসদ নির্বাচন নিয়ে যে বিতর্ক, সেটি কিছুটা হলেও কমবে। তারা দেখাতে পারবে বিএনপি সংসদ নির্বাচন না করে ভুল করেছে। দ্বিতীয়ত, সরকারি দলের কৌশলের মধ্যে বিএনপি নির্বাচনে গেলেও ভালো করতে পারবে না। দু-একটিতে হয়তো দলের প্রার্থীরা জয়ী হতে পারবেন। কিন্তু এ সরকারের অধীন নির্বাচন না করার বিএনপির দীর্ঘদিনের আন্দোলনে তৈরি হওয়া নৈতিক অবস্থান নষ্ট হবে। ভোটে যাওয়ার পক্ষের নেতাদের মত হলো, কর্মসূচিও নেই। ভোটে যদি না যায় তাহলে দল সক্রিয় হবে কীভাবে। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা বা কী করবেন। ভোটে গেলে তারা কিছুটা হলেও চাঙ্গা হতেন।
জানতে চাইলে দলের ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের দু-একজন বাদে প্রায় শতভাগ নেতা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। দলের স্থায়ী কমিটিতে সেই সিদ্ধান্ত হয়েছে। ওই সিদ্ধান্তের আলোকে আমরা মাঠে কাজ করছি।’
সর্বশেষ গত ২২ এপ্রিল দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপজেলা নিয়ে আলোচনার সিদ্ধান্ত দলের সব বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকদের জানিয়ে দেওয়া হয়। এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সেই আলোচনায় উপজেলা নির্বাচনের প্রসঙ্গও ছিল।
উপজেলা নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর ইতিমধ্যে বিএনপি যে ৭৬ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সেই তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৭৬ জনের মধ্যে ৫৮ জন উপজেলা, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পদধারী নেতা রয়েছেন। অন্যরা সাবেক নেতা ও তাদের স্বজন। সাবেক নেতাদের পদ না থাকলেও দলের প্রাথমিক সদস্যপদ আছে অনেকের।
এর আগে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের সংগঠনের সিদ্ধান্ত অমান্য করে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (বার অ্যাসোসিয়েশন) সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। ফলে তাকে আইনজীবী ফোরাম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে কথা বলেই আইনজীবীরা খোকনকে দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে বলেছিলেন। এ ঘটনায়ও বিএনপির আইনজীবীদের মধ্যে বিরোধী সৃষ্টি হয়েছে। ব্যারিস্টার খোকন দলের কোনো কোনো আইনজীবীর কঠোর সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছেন।
ঘটনাটি বিএনপির ভেতরে আলোচনার বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। পরে গত সপ্তাহের বুধ ও বৃহস্পতিবার প্রায় দুই দফা বৈঠকের ওপর মাহবুব উদ্দিন খোকনের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হবে তা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে ব্যারিস্টার খোকনকে ফোরাম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
২০২১ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন আর কোনো নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিএনপি স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচন বর্জন করে আসছে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে যারা সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন, তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।